মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য চীন, যা এরই মধ্যে দেশটির অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার শুরু করেছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুসারে, বিদ্যমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝে চীনে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) দেশটির এফডিআই খাতে নিট অর্থপ্রবাহ ছিল ৮৭০ কোটি ডলার। চীনের বৈদেশিক মুদ্রাবিষয়ক কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণে বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদি হলে দেশটির জিডিপিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
প্রতিবেদন অনুসারে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং বেইজিং-ওয়াশিংটন বাণিজ্য বিরোধ নিয়ে উদ্বেগ চীনে বিদেশী পুঁজির বিনিয়োগ আগ্রহকে দমিয়ে রেখেছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন সময়ে আসা এফডিআই ২০২২ সালের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) সর্বোচ্চ প্রবাহের ১০ শতাংশেরও কম।
সাংহাইয়ের মহামারী লকডাউনে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) চীনে এফডিআইয়ে ধস নামে। এরপর ২০২৩ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) চীনে প্রথমবারের মতো নিট বহিঃপ্রবাহ দেখা যায়। ২০২৪ সালের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রান্তিকেও নিট বহিঃপ্রবাহ বিদ্যমান ছিল। তবে চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে আবারো নিট প্রবাহ দেখা যায়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফেরার পর প্রথম ধাপেই চীনের বিরুদ্ধে শুল্ক অস্ত্র জোরদার করেন। এক পর্যায়ে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানির ওপর শুল্ক ১৪৫ শতাংশে চড়ে। এ বিবাদে বেইজিংও দমে যায়নি, তারাও ওয়াশিংটনের পর ১২৫ শতাংশ শুল্ক চড়িয়ে দেয়। তবে অল্প সময় পরই বাণিজ্য আলোচনার মাধ্যমে মে মাসে চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক কমিয়ে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনে যুক্তরাষ্ট্র। তার পরও যুক্তরাষ্ট্রে রফতানিকারকদের জন্য ব্যয় এখনো উচ্চ মাত্রায় রয়েছে।
এরই মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে ট্রান্সশিপমেন্টের ওপর শুল্ক দেয়া হয়েছে। চীনের এফডিআই কমে আসার সঙ্গে এরও সংযোগ দেখছেন জাপানের গবেষণা সংস্থা দাই-ইচি লাইফ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উদীয়মান বাজার বিভাগের প্রধান অর্থনীতিবিদ তোরু নিশিহামা। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই ট্রান্সশিপমেন্ট বিষয়ে সতর্ক হচ্ছে, ফলে পুরো সরবরাহ চেইন পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হচ্ছে।’
চীনের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো রফতানি। দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কভিড-পরবর্তী সময়ে পুনরুদ্ধারের তুলনায় শ্লথ হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ প্রবৃদ্ধির আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে বলে একাধিকবার সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু রিয়েল এস্টেট খাতে পতনসহ কিছু বিষয় দেশটির অর্থনৈতিক সম্প্রসারণে বাধা হয়েছে দাঁড়িয়েছে, যা চীনের ভোক্তা চাহিদায় পতনে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। এর সঙ্গে রয়েছে ধারাবাহিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার আগে ও স্থগিত পরবর্তী সময়ে অগ্রিম ক্রয়াদেশের দেশটির রফতানি হঠাৎ বেড়ে গেলেও সম্প্রতি কমে এসেছে।
পরিসংখ্যান অনুসারে, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে চীনের জিডিপি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু সে হার জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কম।
এদিকে চীনের সরকারি পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্যমতে, গত মাসে উৎপাদক মূল্যসূচক (পিপিআই) প্রত্যাশার তুলনায় বেশি কমেছে। একই সময়ে অপরিবর্তিত রয়ে গেছে ভোক্তা মূল্যসূচক। চীনের দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও অব্যাহত বাণিজ্য অনিশ্চয়তার কারণে এসব তথ্য ভোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের মনোভাবের ওপর প্রভাব পড়ছে তা স্পষ্ট করে।
এ ধরনের প্রেক্ষাপটে চীনে কার্যক্রম সংকুচিত করছে বিদেশী কোম্পানিগুলো। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সিটিগ্রুপ গত জুনে এক ঘোষণায় চীনে কোম্পানিটির প্রযুক্তি বিভাগ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কর্মী ছাঁটাই করার কথা জানিয়েছে। পরের মাসেই সাংহাইয়ের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ল্যাব বন্ধের পরিকল্পনা নিশ্চিত করেছে আরেক বৈশ্বিক জায়ান্ট অ্যামাজন।
জাপানি কোম্পানিগুলোও চীনে উপস্থিতি কমাচ্ছে। গত মাসে মিৎসুবিশি মোটরস জানিয়েছে, তারা চীনে ইঞ্জিন উৎপাদন বন্ধ করবে। একই সঙ্গে একটি যৌথ উদ্যোগ বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিয়েছে কোম্পানিটি। এর আগে জুনে বিশেষায়িত রেস্তোরাঁ চেইন কুরা সুশি জানিয়েছে, মূল ভূখণ্ড চীনের সব আউটলেট বন্ধ করে বাজার ছাড়বে তারা।
এদিকে বিদেশী বিনিয়োগ বিষয়ে পরস্পরবিরোধী নীতি পরিলক্ষিত হচ্ছে চীনে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, উৎপাদন খাতে বিদেশী বিনিয়োগের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করেছে বেইজিং। কিন্তু একই সঙ্গে ২০১৪ সালে কাউন্টারএসপিওনাজ ল প্রণয়নের পর থেকে বিদেশীদের ওপর নজরদারি জোরদার করেছে। চীনের একটি আদালত গত মাসে জাপানি ওষুধ কোম্পানি আস্তেলাস ফার্মার এক কর্মীকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তিন বছর ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। এ উদাহরণ টেনে প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, জাপানি কর্মী ও চীনে বসবাসরত জাপানিদের উদ্বেগ দূর না হলে দেশটি থেকে বিনিয়োগ কমার আশঙ্কা রয়েছে।
মার্কিন ও চীনা সরকার শুল্ক বিবাদ নিরসনে এ পর্যন্ত মন্ত্রী পর্যায়ে তিন দফা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কোনো ঐক্যে পেঁৗছাতে পারেনি দেশ দুটি। এ কারণে শুল্ক বিবাদ নিরসনে কোনো সমাধানের সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত। বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতির মধ্যে চলমান বিরোধ চীনে বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করবে বলে ধারণা খাতসংশ্লিষ্টদের। এতে বিদেশ থেকে চীনে পুঁজি ও জনবল প্রবাহ কমায় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির গতি শ্লথ হতে পারে, যা দেশটির অর্থনৈতিক স্থবিরতাকে দীর্ঘায়িত করবে।